‘স্বাস্থ্য সেবার উপর রাজনৈতিক সমস্যার ছায়া পড়া উচিত নয়’


এই সামাজিক উদ্যোক্তা বলেন  এখন সময় দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাস্থ্যসেবার জন্যে একটি নিখুঁত প্রক্রিয়ার বিবেচনা করা।

বাংলাদেশভিত্তিক সামাজিক উদ্যোক্তা সিলভানা সিনহা সকল ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি সম্পন্ন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে তুলতে আশাবাদী, যা প্রাভা হেলথ কেয়ার নামে পরিচিত। সম্প্রতি প্রাভা ব্যাঙ্গালোর ভিত্তিক নারায়ণা হৃদায়ালানার সাথে একটি চুক্তি করে। তিনি দা হিন্দুকে বলেন যে, আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে এই প্রক্রিয়ার আওতায়ভুক্ত ভারতের প্রতিবেশী লাখো মানুষকে সহযোগিতা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা।

 

দক্ষিণ এশিয়ায় বাকি অংশের তুলনায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সূচক বহু বছর ধরেই ভাল। তবে দেশ কোথায় পিছিয়ে আছে বলে আপনি মনে করেন?

এটা সঠিক যে সামাজিক উন্নয়ন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশ ভালো করছে এবং এজন্যে আমরা গর্বিত। সরকার স্বাস্থ্যের জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেসরকারী সংস্থার সমস্ত উপর দায়বদ্ধতা অবলুপ্ত করেছে। এমনকি জেলা পর্যায়ে স্থানীয় উপজেলা কমপ্লেক্স চালানোর ক্ষমতাও তাদেরকে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং গ্রামীণ এলাকায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে যার জন্যে আপনি সূচকে উন্নতি দেখেন। কিন্তু ভারতে আপনি বিশ্বের কয়েকটি সেরা স্বাস্থ্যসেবা সুবিধাগুলোর একটিতে অ্যাক্সেস করতে পারেন, যা বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভব নয়। অতঃপর বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষজ্ঞ সুবিধা, বা আন্তর্জাতিক মানের ডায়াগনোসিস পেতে হলে আপনাকে বাংলাদেশের বাহিরে যেতে হবে। সেটিও যদি না আপনি সামর্থ্য রাখেন। উদাহরণস্বরূপ আমি অনেক ঘটনাই জানি যারা ডায়াবেটিস পরীক্ষার জন্য প্রতি তিন মাস অন্তর ব্যাংকক ভ্রমণ করেন, যা অযৌক্তিক।

 

আপনার মিশন সম্পর্কে আমাদের বলুন।

আমি স্বাস্থ্য খাতে কিছু করার নিমিত্তে তিন বছর আগে আমার যাত্রা শুরু করলেও কোন ব্যাপারটিকে ধরতে হবে তা আমি জানতাম না। রোগী, চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক সাধারণ পেশাদারদের সাথে কথা বলার পর আমি দেখলাম যে কোথায় ফাঁক ছিল এবং কেন ডায়াগনোসিস এত খারাপ ছিল। বোন (হাড়) টিউমার হিসেবে রোগ নির্ণয় বা ডায়াগনোসিসের পর আমার চাচীকে অবিলম্বে রেডিয়েশনের ১০টি সেশন নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তারপরও তিনি বিদেশ ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন এবং ডায়াগনোসিসের ডাবল চেক করেন। প্রকৃতপক্ষে দেখা যায় তার অস্টিওপোরোসিস ছিল এবং রেডিয়েশন তার মৃত্যু ঘটাতে পারতো। আমি ভ্রমণ কালে উপলব্ধি করলাম যে এরকম হাজারো ঘটনা রয়েছে। প্রায় একই সময়ে আমি ভারপ্তে যাতায়াতরত রোগীদের উপর একটি নিবন্ধ পড়ি। তাদের ব্যবহৃত শব্দের মধ্যে এক নম্বরে ছিল "বিশ্বাস", এবং তারা মনে করতেন বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা এতই চাপে থাকতেন যে, তারা রোগীর উপর পরিপূর্ণ মনোযোগ দিতে পারতেন না। আমি অনুভব করি বিশ্বাস ও মানের মাঝে এই বিরাজমান ফাঁকা জায়গাটি নিয়ে আমার পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তাই আমি বহির্মুখী সুবিধার সাথে [একটি] বিশ্বমানের প্যাথলজি ক্লিনিক চালু করার সিদ্ধান্ত নেই। আমরা আগস্ট মাসে আমাদের প্রথম সুবিধাটি চালু করেছি এবং আগামী ৯ বছরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে অনুরূপ ৩০ টি ফ্যাসিলিটি গঠড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। হিসাব অনুযায়ী ভারতের মতো স্বাস্থ্য সুবিধা বাংলাদেশে আনতে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে।

 

এই চাহিদার কতটা ভারতীয় হাসপাতাল দ্বারা পূরণ করা হচ্ছে?

সংখ্যার মান পরিবর্তনশীল, কিন্তু ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশন প্রতিদিন শুধুমাত্র চিকিৎসার জন্য ২,০০০ ভিসা প্রদান করে। কিন্তু মেডিকেল ভিসা পাওয়া কঠিন। আরো কিছু সংখ্যক মানুষ পর্যটক ভিসায় চেক আপ এবং অস্ত্রোপচারের জন্য ভারতে যান। যার অর্থ অন্তত ৩০০,০০০ থেকে ৫০০,০০০ বাংলাদেশি বছরে চিকিৎসার কারণে ভারতে যাতায়াত করেন।

 

এই বৃহৎ বাজারকে বিবেচনা করলে, কিভাবে ভারত ও বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নয়নের পাশপাশি ভিসার গণ্ডি পেরিয়ে  সহযোগিতার হাত বাড়াতে পারে?

আমি মনে করি এখন সময় দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাস্থ্য সেবার একটি নিখুঁত প্রক্রিয়া বিবেচনা করা। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষেত্রেও বিবেচ্য যাদের নাগরিকেরা অস্ত্রোপচারের জন্য ভারতে যান। আমি জানি যে আফগানিস্তান, নেপাল, মালদ্বীপ, এমনকি পাকিস্তান থেকেও হাজার হাজার লোক ভারতে যান। অতএব ভারতীয় হাসপাতাল এবং এর মানদণ্ডের প্রতিলিপি না করতে পারলেও আমরা প্রতিপালকের সুবিধা প্রতিষ্ঠা করতে পারি, যা ভারতে যাতায়াতের পূর্বেই রোগীর যত্ন নিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাভা হেলথকেয়ার নারায়ণ হ্রদয়ালায়ার সাথে অংশীদারিত্বের চুক্তি সই করেছে, যেখানে নারায়ণা একাই বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১০০,০০০ রোগীর অস্ত্রোপচার পর্যবেক্ষণ করে। এখন আমরা ভ্রমণের পুর্বেই রোগীদেরকে প্রস্তুত করতে পারি, পরীক্ষা চালাতে পারি, এবং সার্জারি-পরবর্তী যত্নের জন্য হাসপাতালের সাথে সমন্বয় করতে পারি। সকল দেশ একে অপর থেকে শিখতে পারার মাধ্যমে আরো বেশী সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

 

স্বাস্থ্য পরিচর্যায় বৃহত্তর সংকট সম্পর্কে কী বলা যায়: যেসকল মহামারীগু্লো দক্ষিণ এশিয়ায় সাধারণ, যেমন যক্ষ্মা, বা এইচআইভি / এইডস?

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রাভাতে আমরা প্রতিটি ডায়াবেটিক রোগীর স্ক্রিনিং করতে আশাবাদী, যা একটি বড় সমস্যা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ লোক প্রাক-ডায়াবেটিক বা ডায়াবেটিক। আমরা এইচআইভি স্ক্রীনিংও প্রস্তাব করি, এবং ভবিষ্যতে আমরা সরকারের সাথে একই স্তরে কাজ করতে চাই। তবে আমার অগ্রাধিকার হচ্ছে মানসম্পন্ন পাবলিক স্বাস্থ্য সেবাতেও যে মুনাফা হয়, তা প্রমাণ করা। যারপর আমরা ভর্তুকি, বিকল্প অর্থায়ন এবং বিনামূল্যে সেবা প্রদানের উপর কাজ করতে আশা রাখি। আসলে স্বাস্থ্যসেবা স্বক্রিয়ভাবে টেকসই হওয়া জরুরি। সুতরাং যদি আপনি অর্থ উপার্জন করে থাকেন, তাহলে একটি ভিত্তি স্থাপন করুন, অতঃপর আপনার লভ্যাংশকে উদ্যোগে পরিণত করুন।