প্রাভা কমিউনিটিতে স্বাগতম

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করুন, ডায়াবেটিস যেন আপনাকে নিয়ন্ত্রণ না করে!


আমার মা প্রতিদিন সকালে ৫টায় উঠে পড়েন, তার প্রার্থনা শেষ করেন এবং পরিবারের জন্য নাস্তা তৈরি করতে রান্নাঘরে প্রবেশ করেন। এখন আবার মনে করবেন না যে আমাদের ঘরে সহায়তা করার কেউ নেই, তবে বাংলাদেশের অধিকাংশ মায়ের মতই, আমার মা নিজেদের জন্যে রান্নাটা একদম নিজ হাতেই সারতে পছন্দ করেন। নাস্তার পর, তিনি ৮টায় বাড়ি থেকে চলে যান স্কুলে কাজ করতে যেখানে তিনি প্রিন্সিপাল। তিনি বিকেল ৩টায় ফিরে বাড়ীতে আসেন এবং তার নাতিনাতনির সঙ্গে সময় কাটান এবং সন্ধ্যা ৭টায় রান্নাঘরে ফিরে যান রাতের খাবার তৈরি করতে। তার দিন শেষ হয় রাত ১২টায় যখন তিনি ঘুমাতে যান।

 

৬০ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে হওয়া সত্ত্বেও, আমার মায়ের অবিশ্বাস্য রকম শক্তি, এবং বলার অপেক্ষা থাকে না যে তিনি গত দুই দশক ধরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। যাইহোক, তিনি সবসময় শারীরিকভাবে এতটা ফিট ছিলেন না। ডায়াবেটিসের মাধ্যমে আক্রান্ত হওয়ার আগে, তিনি সবসময় ক্লান্ত থাকতেন, এবং প্রায়ই ক্ষুধার্ত বা তৃষ্ণার্ত হয়ে যেতেন। তার ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় ডাক্তারের নির্দেশনা অনুসরণ করা শুরু করার পরে - তার খাবার এবং ব্যায়ামের পরিবর্তন ঘটানোর পর - তিনি অনেক সুস্থ বোধ করতে শুরু করেন এবং এখন তিনি নিজেই তার অবস্থাটির নিয়ন্ত্রণ করেন।

 

ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ যা হলে শরীর ইনসুলিন উত্পন্ন করতে পারে না বা তৈরি করতে পারলেও ইনসুলিন সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। ইনসুলিন হলো হরমোন যা দেহে গ্লুকোজ পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে। একজন ডাক্তার হিসেবে আমি ডায়াবেটিসকে অধিকাংশ মানুষের তুলনায় আরও একটু ভালো করে বুঝি এবং সরাসরি অভিজ্ঞতা থেকে এই রোগের মোকাবেলা কিভাবে করা যায় তা আমি বুঝতে পেরেছি, সাথে এটাও জেনেছি যে এই রোগ সম্পর্কে সচেতন হওয়া কতটুকু কার্যকর হবে এবং যদি সঠিকভাবে পরিচালিত না করা হয় কীভাবে এটা মৃত্যু ঘটাতে পারে।

 

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি বিবেচনা করলে বোঝা খুব কষ্টকর নয় যে এখানে বিশ্বস্ত ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ত্রুটিসমূহ রয়েছে। আমি দীর্ঘদিন ধরে চিন্তাভাবনা এবং বিবেচনা করেছি যে এই স্বাস্থ্যসেবা খাতে পরিবর্তন আনার জন্যে আমি নিজে কি ভূমিকা পালন করতে পারি। যখন আমি প্রথম প্রাভা হেল্‌থ সম্পর্কে শুনলাম এবং সিইও সিলভানা সিনহা’র সাথে দেখা করলাম, তখন আমি তাৎক্ষণিকভাবে বুঝে গেলাম যে এটি এমন একটি স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা যেখানে আমি সবসময়ই কাজ করতে চেয়েছিলাম। এই স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা মানুষদের যত্ন নেয় এবং সমবেদনা ও সহমর্মিতার সাথে সেবা প্রদান করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি হচ্ছে এখানে প্যাথলজিতে সঠিক নির্ণয়ের এবং পরীক্ষার ফলাফল প্রদান করা হয়। প্রাভা হেল্‌থ মানুষদের তাদের শারীরিক অবস্থা বুঝতে এবং তাদের শরীর ও অসুস্থতাগুলো ভালমত মোকাবেলা করতে সাহায্য করবে।

 

আমি ডায়াবেটিস রোগটিকে অত্যন্ত্য ব্যক্তিগতভাবে নেই এবং এর সম্পর্কে গবেষণা করার এবং শেখার জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ সময় ব্যয় করি, কারণ আমি বিশ্বাস করি এই ধরনের একটি বিস্তৃত রোগের ফলে অনেক মানুষ প্রভাবিত হয় - এবং প্রাভা এই কাজটি করতেও সাহায্য করবে।

 

সারা বিশ্বে ডায়াবেটিস হচ্ছে অন্ধত্ব, কিডনির অক্ষমতা, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের একটি প্রধান কারণ। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএইচও) অনুযায়ী, ২০১৪ইং সালে ১৮ বছরের বেশি বয়সের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে দাঁড়ায় ৮.৪%-এ। বাংলাদেশে শুধুমাত্র ২০১৫ সালেই ৭.১ মিলিয়নেরও মানুষের ডায়াবেটিস ধরা পড়ে, যা বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস আক্রান্ত মোট জনসংখ্যার ১.৭১%। ২০১৪ সালে একটি জাতীয় জরিপের ফলাফলে দেখা যায় যে বাংলাদেশে ৯.৭% প্রাপ্তবয়স্কদের ডায়াবেটিস আছে – যা ৫% হতে ২০০১ সাল থেকে দ্বিগুণ হারে বেড়েছে। এমনকি আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অতিরিক্ত আরও ২২.৪% মানুষের প্রি-ডায়াবেটিস ছিল সেই সময়ে

 

ডায়াবেটিসের বৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন সম্প্রতি রিপোর্ট করেছে যে দক্ষিণ এশিয়াতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৫২.১% মানুষই তাদের অবস্থার ব্যাপারে জানেন না। বাংলাদেশে একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৫৬% মানুষই জানেন না তাদের ডায়াবেটিস আছে, এবং তাদের মধ্যে মাত্র ৪০% মানুষ নিয়মিতভাবে চিকিত্সা গ্রহণ করছেন।

 

ডায়াবেটিসের প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বাংলাদেশী মানুষদের অবশ্যই নিজ দায়িত্বে জানার ও শেখার প্রয়াস বহাল রাখতে হবে। যথাযথ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে, অনেক ডায়াবেটিক্ মানুষই দীর্ঘ, সুস্থ ও পরিশীলিত জীবন বাস করতে পারেন।

 

প্রি-ডায়াবেটিস

যদি আপনার নিম্নলিখিত প্রি-ডায়াবেটিস ঝুঁকির নিম্নলিখিত কারণগুলোর কোনটি থেকে থাকে তবে আপনার রক্তের গ্লুকোজের স্ক্রিনিং পরীক্ষা করার জন্য আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নিন:

  • অতিরিক্ত ওজন, শরীরের ভর সূচকের ২৫-এর তুলনায় বেশী
  • আপনি নিষ্ক্রিয় থাকেন
  • আপনার বয়স ৪৫ বছরের বেশী
  • আপনার পরিবারে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ইতিহাস আছে
  • আপনি গর্ভাবস্থায় জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস থেকে আক্রান্ত হয়েছেন বা প্রসবের সময় আপনার শিশুর ওজন ৪ কেজির বেশী ছিল
  • আপনার পলিসিসটিক ওভারী সিন্ড্রোম আছে
  • আপনার উচ্চ রক্তচাপ আছে
  • আপনার হাই ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন (এইচডিএল) কোলেস্টেরল প্রতি লিটারে ০.৯ মিলিমোলসের নিচে, অথবা আপনার ট্রাইগ্লিসারাইডের স্তর প্রতি লিটারে ২.৮৩ মিলিমোলসের উপরে আছে।  

 

ডায়াবেটিস তিন ধরনের হয়: টাইপ ১, টাইপ ২ এবং জেস্টেশনাল (গর্ভাবস্থায় যা হতে পারে)। আমি আপনাদের জন্যে প্রতিটির লক্ষণ, কারণ, ঝুঁকির উপাদান সমূহ এবং চিকিত্সা সহ বিভিন্ন দিকের ব্যাখ্যা করব।

 

টাইপ ১ ডায়াবেটিস

এটি জুভেনাইল (কৈশোর সম্পর্কিত) ডায়াবেটিস নামেও পরিচিত এবং বিশেষত অল্প বয়সেই এর বিকাশ হয়। বয়স্ক ব্যক্তিদেরও এটা হতে পারে, কিন্তু সে সম্ভাবনা অনেক কম। এই ধরনের ডায়াবেটিস হলে ইমিউন (শরীরের রোগ প্রতিরক্ষা) সিস্টেম ইনসুলিন উৎপন্নকারী বিটা সেলস নামক অগ্ন্যাশয়ের অভ্যন্তরীণ কোষ ধ্বংস করে ফেলে, তাই শরীর আর ইনসুলিন উৎপাদন করতে সক্ষম থাকে না।

 

কারণ সমূহ:

ডায়াবেটিসের এই ধরনের বিকাশের কারণটি এখনও স্পষ্ট নয়, তবে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে ডায়াবেটিস টাইপ ১ ডায়াবেটিস এইচএলএ’র জটিল, মানব লিউকোসাইট অ্যান্টিজেনের মধ্যে বিকশিত হতে পারে, যা দেহে প্রতিরক্ষার একটি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

 

রোগের লক্ষণ সমূহ:

  • তৃষ্ণা
  • ক্ষুধা (বিশেষত ডিনারের পরে)
  • ক্লান্তি
  • দ্রুত শ্বাস
  • পেট ব্যাথা
  • ক্রমাগত ত্বক এবং মূত্রনালির সংক্রমণ
  • ঘন ঘন প্রস্রাব

 

ঝুঁকির উপাদান সমূহ:

  • পারিবারিক ইতিহাস
  • জেনেটিক্স
  • বয়স

 

চিকিত্সা সমূহ:

  • ইনসুলিন নেয়া
  • কার্বোহাইড্রেট গণনা করা
  • রক্তের গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ
  • স্বাস্থ্যকর খাবার এবং শর্করার ব্যবস্থাপনা করা
  • নিয়মিত ব্যায়াম এবং ওজন চেক করে রাখা

 

টাইপ ২ ডায়াবেটিস

এটি ডায়াবেটিসের সবচেয়ে সাধারণ রূপ। কোন কিছু না জেনেই একজন মানুষ বছরের পর বছর ধরে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত থাকতে পারে। এই ধরনের ডায়াবেটিসে শরীর ইনসুলিন উৎপন্ন করে ঠিকই, তবে কোষগুলি সঠিকভাবে তা ব্যবহার করতে পারে না এবং ডাক্তাররা একে "ইনসুলিন রেসিস্ট্যান্স" বলে।

 

কারণ সমূহ:

এই ধরনের ডায়াবেটিস বিকাশের সঠিক কারণটি এখনও অজানা, তবে জেনেটিক্স, পরিবেশ, অতিরিক্ত ওজন এবং নিষ্ক্রিয়তার মতো বিষয়গুলি এখানে মূল ভূমিকা পালন করে। 

 

রোগের লক্ষণ সমূহ:

  • বর্ধিত ক্ষুধা (পলিফেজিয়া)
  • বর্ধিত তৃষ্ণা (পলিডিপ্সিয়া)
  • প্রস্রাবের হার বৃদ্ধি (পলিইউরিয়া)
  • ওজন হ্রাস
  • অবসাদ
  • ত্বকের বিভিন্ন স্থান গাড় রঙ ধারণ করা
  • বার বার ইনফেকশন বা সংক্রমণ হওয়া
  • ঝাপসা দৃষ্টি

 

ঝুঁকির উপাদান সমূহ:

বয়স

প্রি-ডায়াবেটিস

ওজন

পারিবারিক ইতিহাস

শরীরে চর্বির বিতরণ

ব্যায়ামের অভাব

 

চিকিত্সা সমূহ:

স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করা

শারীরিক কার্যকলাপ বজায় রাখা

নিয়মিত রক্তের গ্লুকোজের নিরীক্ষণ করানো

ডায়াবেটিসের ওষুধ এবং ইনসুলিন নেয়া

 

জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস

প্রায় ৪-৫% নারী গর্ভাবস্থায় জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসের বিকাশ হয়। গর্ভাবস্থায় জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, নাহলে এটা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের বিকাশের দিকে পরিচালিত হতে পারে।

 

কারণ সমূহ:

গর্ভাবস্থায় শরীরে প্লাসেন্টা তৈরির ফলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। সাধারণত, এই সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য শরীর নিজেই যথেষ্ট ইনসুলিন তৈরি করতে পারে, তবে যদি সেটা করতে অক্ষম হয় তাহলে জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসের বিকাশ ঘটে।

 

রোগের লক্ষণ সমূহ:

সাধারণত, এই ধরনের ডায়াবেটিসের কোন সুস্পষ্ট লক্ষণ নেই, তবে ডাক্তারদের পরামর্শ হচ্ছে গর্ভাবস্থায় ২৪ এবং ২৮ সপ্তাহের মধ্যে স্ক্রীনিং করানো উচিত।

 

ঝুঁকির উপাদান সমূহ:

  • গর্ভাবস্থার আগেই ওজন বৃদ্ধি
  • রক্তের গ্লুকোজের (​​শর্করার) উচ্চ মাত্রা
  • ডায়াবেটিসের পারিবারিক ইতিহাস
  • জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসের পূর্ববর্তী ইতিহাস

 

চিকিত্সা সমূহ:

  • নিয়মিত রক্তের গ্লুকোজের (​​শর্করার) মাত্রা নিরীক্ষণ
  • কেটোনের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রস্রাব পরীক্ষা
  • স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করা
  • ব্যায়াম করা

 

ডায়াবেটিস নিয়ে জীবিত থাকার চিন্তা হয়তো ভয়ের কারণ হতে পারে, বিশেষ করে যখন জানা যায় যে ২০১৬ সালেও এর কোন প্রতিকার নেই, কিন্তু সবটাই খারাপ সংবাদ নয়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি যদি তার জীবনধারার পরিবর্তন করেন এবং কিছু যথাযথ ঔষধ গ্রহণ করেন তাহলে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন চালনা করতে তার কোন সমস্যাই হবার কথা নয়।

 

এবং যেমনটা আমি সবসময় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কাউকে বলি - "ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করুন, ডায়াবেটিস যেন আপনাকে নিয়ন্ত্রণ না করে!"